বইকেন্দ্রিক ইলম অর্জন : সালাফদের বক্তব্য ও কিছু কথা

বইকেন্দ্রিক ইলম অর্জন : সালাফদের বক্তব্য ও কিছু কথা

সাম্প্রতিক সময়ে প্রয়োজনীয় দ্বীনি বই এখন অনেকটা সহজলভ্য। আরবী উর্দুই শুধু নয়—মৌলিক ও অনূদিত প্রচুর বাংলা বইও বাজারে এসেছে এবং আসছে। এটা তো আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের জন্যে বিশাল বড় একটি রহম যে—আল্লাহ আমাদের জন্যে দ্বীন শিক্ষা করা সহজ করে দিচ্ছেন। এছাড়া এর বেশকিছু ফায়দাও রয়েছে। কিন্তু এতবেশ ভালোর সাথে আরো বেশকিছু খারাপ মনোভাবও লক্ষনীয়।

১. হাতের লাগালে বই থাকাতে বই থেকে ইলম শিখাকে অনেকে যথেষ্ট মনে করছে।

২. শুধু বই পড়েই বিভিন্ন শাস্ত্রীয় বিষয়ে কথা বলার জন্যে নিজেকে যোগ্য ভাবা। অনেকের মাঝে আরো একধাপ এগিয়ে শাস্ত্রীয় আলোচনার জন্যে বিভিন্ন ইংরেজি স্কলারদের লেকচার আর বাংলা বই পত্র পড়াকে যথেষ্ট জ্ঞান করতেছে! আল্লাহর কাছে পানাহ।

বিষয়টির ভয়াবহতা অনেকের কাছেই তেমন গুরুত্ব বহন করেনা৷ অথচ ইমাম নববি রহ. শুধু কিতাবকে স্বয়ংসম্পূর্ণভেবে ইলম অর্জনের মাধ্যম বানানোকে মারাত্মক ধরনের ফাসাদের কারণ বলেছেন৷ যেহেতু এই বিষয়ে সালাফদের সতর্কবাণী পড়ার তাওফিক হয়েছে এবং নিজের জীবনে কিছু অভিজ্ঞতাও হয়েছে তাই এই বিষয়ে সালাফদের বক্তব্য ও নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু কথা বলা মুনাসিব মনে করছি।

প্রথমে হাদিস ও সালাফদের বক্তব্য দিয়েই শুরু করি।

১. হযরত আবু উমামাহ রা. থেকে বর্নিত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন—ইলম প্রস্থান হয়ে যাওয়ার পূর্বেই তোমরা ইলম শিখে নেও৷ এই কথা শুনে সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন—ইলমের প্রস্থান কিভাবে হবে? আল্লাহর নবি এবং আল্লাহর কিতাব আমাদের কাছে আছে? এই কথা শুনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রচুর রাগান্বিত হলেন। এবং বললেন— তোমাদের মরণ হোক! বনী ইসরাইলের মাঝে কি তাওরাত ও ইঞ্জীল ছিল না, কিন্তু এতে তো তাদের কোনোই উপকার হল না! ইলমের প্রস্থানের অর্থ তার বাহকগণের প্রস্থান।(১)

২. হযরত আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্নিত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন— অচিরেই তোমাদের সামনে এমন একটি যামানআ আসবে তোমাদের মাঝে পাঠক হবে প্রচুর। কিন্তু দ্বীনের বুঝ থাকবে এমন মানুষের সংখ্যা হবে একদম কম। এবং তোমাদের মাঝে ‘হারজ’ বেড়ে যাবে। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন— হারজ কি ইয়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন— তোমাদের মাঝে খুনাখুনি (২)

৩. ইমাম নববি রহ. বলেন— ওলামায়ে কেরাম বলেন— তুমি ইলম এমন কারো কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবেনা যারা কোনো শায়খের সোহবত না গ্রহণ করে শুধু কিতাবের পাতা থেকে ইলম অর্জন করে।

যারা উস্তাদ বাদ দিয়ে শুধু কিতাবের থেকে ইলম অর্জন করে তাদের ভুল বেশি হয়। এবং তাদের থেকে অনেক তাহরিফ ও বিকৃতি প্রকাশ পায়। (৩)

৪. ইমাম শাফেয়ী রহ. বলেন—

مَنْ تَفَقَّهَ مِنْ الْكُتُبِ ضَيَّعَ الْأَحْكَامَ

যে (শুধু) বইপত্র থেকে ফিকহ অর্জন করে সে (শরীয়তের) বিধিবিধান ধ্বংস করে।(৪)

৫. ইমাম শাতেবী রহ. বলেন—“ইলম প্রাথমিকভাবে দুই প্রকার। এক. অতীব জরুরি; যা জন্মগতভাবেই মানুষ জানে। উদাহরণস্বরূপ—জন্মগতভাবেই একটি বাচ্চা এই জ্ঞান নিয়ে জন্মায় যে, খিদে পেলে তাকে কাঁদতে হবে। দুই. তা’লিমের মাধ্যমে যে-ইলম অর্জন করতে হয়। যে ইলম অর্জনের জন্য ভাবনা ও চিন্তার দরকার হয়, সে ইলমের জন্য অবশ্যই একজন মুআল্লিম প্রয়োজন। কেউ-কেউ মতবিরোধ করে—মুআল্লিম ছাড়া আদতে ইলম অর্জন করা সম্ভব, নাকি অসম্ভব? সম্ভাব্যতা মেনে নেওয়া যায় বটে; কিন্তু সাধারণ বাস্তবতা হলো—মুআল্লিম ছাড়া কোনো গতি নেই। সামগ্রিকভাবে এ ব্যাপারে সকলের ঐকমত্য আছে।...শিক্ষক যে অপরিহার্য—এটা বোঝার জন্য যুগ-যুগ ধরে চলে আসা শিক্ষাপদ্ধতিই যথেষ্ট। তাছাড়া আলিমগণ তো বলেছেন—‘ইলম এককালে ছিল রিজালের অন্তরে; পরে তা স্থানান্তরিত হয়ে গেছে কিতাবের পাতায়। তবে কিতাব খোলার চাবি রয়ে গেছে রিজালের হাতে’। (৫)

এবার নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু বলি।

তখন কাফিয়া জামাতে উঠি৷ উস্তাদ মাওলানা সাইদ সাহেব প্রথম দিন দরসে এসে শাতেবী রহ.-র এই কওলটি মুখস্ত করিয়ে দেন। এবং পরেরদিন আবার সকলকে সবক জিজ্ঞাসা করেন। তখন থেকেই কওলটি আমার মুখস্থ। বাকি এর বাস্তবতা কিছুটা হলেও বুঝে আসে আরো বহু পরে৷

.

যেহেতু উলুমুল হাদিসে দুইবছর উস্তাদদের তত্ত্বাবধানে থেকে কিছু পড়ার তাওফিক হয়েছে। তাই সে অভিজ্ঞতা থেকেই কিছু বলি।

উস্তাদদের কাছে একবছর তামরিন করার পর বিভিন্ন বিষয়ে লেখার জন্যে আমাদের কাছে দায়িত্ব আসতো। কোনো কোনো বিষয়ে পুরো একসপ্তাহ বা তার থেকেও বেশি সময় নিয়ে পর্যাপ্ত ঘাটাঘাটি করে লেখা তৈরি করতাম। লেখা শেষ করে যখন নিজে পড়তাম দেখা যেতো একটি তৃপ্তির ঢেকুর তুলার মত ভাব নিজের ভিতর তৈরি হতো৷ ভাবটা এমন আসতো—উস্তাদকে দেখালে অনেক খুশি হয়ে এক দেখাতেই সাইন দিয়ে ফেলবেন। কিন্তু অধিকাংশ সময়েই সকলের সাথে ঘটনা ঘটতো পুরো উল্টো।

উস্তাদকে দেখানোর পর কখনো এমনো হতো যে—পুরো লেখাটাই বাদ।আবার নতুন করে লেখতো হতো৷ বা লেখায় যে বিষয়টি আমি প্রমান করতে চাচ্ছি বা রদ করতে চাচ্ছি তার জন্যে যে দলিলগুলো এনেছি দলিলের সাথে আমার বক্তব্যের কোনো মিল নেই। অথবা যত জোড়ালোভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করছি—বিষয়টা তেমন নয়৷

এরকম বহু সমস্যা ধরা খেতো উস্তাদের সামনে লেখা পেশ করার পর। যার একটিও দীর্ঘ একসপ্তাহ বা আরো বেশি সময়ে আমার নজরে পড়েনি।

আমাদের উলুমুল হাদিস ও ইফতা বিভাগে যথেষ্ট পরিমান না হলেও কোনো বিষয়ে তাহকিক করার জন্যে পর্যাপ্ত কিতাব আছে৷ দুই বিভাগে প্রায় ‘আট’ কম্পিউটার। এত এত কিতাব ও কিতাব পড়ে বুঝার যোগ্যতা থাকার পরেও প্রায় প্রত্যেকের একটি লেখাতেই কয়েক দফা বড় বড় ভুল উস্তাদরা ধরিয়ে দিতেন। ঠিক তখন ঐ কাফিয়ার সময় শাতেবী রহ.-র মুখস্থ করা নসটি কিছুটা ধরতে পারতাম৷

হাদিস আর হাদিস থেকে ইমামদের বক্তবগুলো ও উস্তাদদের সোহবতে থেকে দুই একটি কাজ করার কারণে শুধু আমার না আমাদের জামাতের প্রায় প্রত্যেকের অবস্থা ছিলো এমন যে—কোনো বিষয় লেখলে তা ঐ বিষয়ের কোনো অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে দেখিয়ে সম্পদনা না করিয়ে নিলে তা অন্তত প্রকাশ করার অনুপযুক্ত মনে করি।

সর্বশেষ একটি কথা বলি—যা শায়খ আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রহ. তার একটি লেখায় উল্লেখ করেছেন। শায়খ রহ. বলেন— সালাফগন বক্তব্য হলো—

من اعظم البلية تشيخ الصحيفة

‘শুধু বই-পত্রকে উস্তাযে পরিণত করা এক মহাবিপদ।’ (৬)

তথ্যসূত্র :

(১) সুনানে আদদারেমী, ইলম শেষ হয়ে যাওয়া অধ্যায়, হাদীস নং২৬০। দারুল বাশায়ের। দ্বিতীয় মুদ্রণ,প্রকাশকাল ১৪৩৪হি. (২০১২)।

(২) মুস্তাদরাকে হাকেম হাদিস নং ৮৪১২। হাকেম রহ. হাদিসটি উল্লেখ করে বলেন—হাদিসের সনদ সহিহ।

(৩) আলমাজমু' শরহু মুহায্যাব ইমাম নববি রহ. ১/৩৬, দারুল ফিকর, প্রকাশকাল

(৪)আলমাজমু’ শরহুল মুহায্যাব ১/৩৮

(৫) আল-মুওয়াফাকাত ১/৬৪, ইমাম শাতিবি; দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, তৃতীয় সংস্করণ, ১৪২৪ হি.। ঈষৎ সংক্ষেপিত।

(৬) যিকরু মাই ইউতামাদু কওলুহু’-র টিকায়

ইলম অর্জন

শেয়ার করুন:

শেখার যাত্রা শুরু করতে চান?

আমাদের কোর্সগুলো দেখুন—নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী বেছে নিন।